সংবাদদাতা, দুর্গাপুর : জ্যৈষ্ঠের তপ্ত দুপুরেও যেন বসন্তের হাওয়া বইছে দুর্গাপুরের সিটি সেন্টার বাস স্ট্যান্ডে। আগামী পয়লা জুন থেকে রাজ্য জুড়ে শুরু হতে চলেছে মহিলাদের জন্য সম্পূর্ণ বিনামূল্যে সরকারি বাস পরিবহন পরিষেবা। এই যুগান্তকারী ঘোষণার পর থেকেই রাজ্যের আর পাঁচটা জায়গার মতো শিল্পশহর দুর্গাপুরের নারী মহলেও বইছে খুশির হাওয়া। বাসের জন্য অপেক্ষা করতে করতেই স্টেশনে ভ্রমণরত মহিলারা মেতে উঠেছেন নিজেদের মধ্যে খোশগল্পে, যেখানে ঘুরে ফিরে আসছে নতুন এই সরকারি সিদ্ধান্তের কথা। কেউ বলছেন ‘সংসারে সুরাহা’, তো কেউ দেখছেন ‘স্বাধীনতার নতুন আকাশ’।
বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রী মধুমিতা দাওয়াতজির চোখে-মুখে একরাশ স্বস্তি। সরকারের এই মানবিক সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়ে বলেন, “সরকারের এই উদ্যোগকে সত্যিই সাধুবাদ জানাই। আমাদের মতো মধ্যবিত্ত বা খেটে খাওয়া সাধারণ পরিবারের মহিলাদের জন্য এটা মস্ত বড় পাওয়া। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকার যেসব দুস্থ মহিলারা চিকিৎসার জন্য বা দিনমজুরির কাজে প্রতিদিন শহরে আসেন, তাঁদের পকেটের ওপর চাপ অনেকটাই কমবে। এই টাকাটা বাঁচিয়ে তাঁরা সংসারের অন্য কাজে লাগাতে পারবেন।”একটু দূরেই দাঁড়িয়ে বাসের সময়সূচী দেখছিলেন অনু চৌধুরী। তিনি জানান, “সরকারি এই উপহার যেমন আনন্দের, তেমনি নাগরিকদেরও কিছুটা দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন। তিনি এক অনন্য বার্তা দিয়ে জানান, “খুবই ভালো উদ্যোগ। যাদের পক্ষে প্রতিদিনের বাসের টিকিটের চড়া মূল্য দেওয়া সম্ভব হতো না, তারাও আজ নিশ্চিন্তে রাজ্যের যেকোনো প্রান্তে যাতায়াত করতে পারবেন। তবে আমার মনে হয়, সমাজের যে সমস্ত উচ্চবিত্ত বা সম্পন্ন মহিলারা টিকিটের মূল্য দিতে সম্পূর্ণ সক্ষম, তাঁদের নিজের দায়িত্বেই টিকিট কেটে বাসে চাপা উচিত। এতে সরকারের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ কমবে এবং পরিবহন ব্যবস্থা সচল ও উন্নত থাকবে।”

আরেক যাত্রী পায়েল নাগ এই আলোচনায় যোগ দিয়ে মহিলাদের আর্থিক স্বাধীনতার দিকটি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “আমাদের সমাজে আজও খুব কম সংখ্যক মহিলাই অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী। অধিকাংশকেই যাতায়াতের খরচের জন্য পরিবারের ওপর নির্ভর করতে হয়। তাই বিনামূল্যে পরিবহনের এই ব্যবস্থা থাকলে মহিলাদের স্বাধীনভাবে চলাফেরায় খুবই সাহায্য হবে।”শুধু আর্থিক সুবিধাই নয়, এই উদ্যোগকে তিনি মহিলাদের স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবেও দাবি করেন। তিনি জানান, “প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মেয়েদের সন্ধ্যের পরে ঘর থেকে বেরোতে মানা করেছিলেন, একপ্রকার ঘরের কোণেই গুটিয়ে রাখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মহিলাদের শুধু অধিকারই দিচ্ছেন না, তাঁদের জন্য বিনামূল্যে সরকারি বাসে চড়ার রাজকীয় ব্যবস্থাও করে দিচ্ছেন। এটাই প্রমাণ করে যে, রাজ্যে এখন মেয়েরা কতটা সুরক্ষিত। তাঁরা যখন খুশি বাইরে বেরোতে পারেন, নির্ভয়ে ঘুরতে পারেন, নিজের ইচ্ছেমতো পোশাকও পরতে পারেন। এই একটা সিদ্ধান্তেই বর্তমান সরকার আপামর নারী সমাজের মন জিতে নিয়েছে।” এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন জেলা তৃণমূল নেতৃত্বও। জেলা তৃণমূলের মুখপাত্র উজ্জ্বল মুখোপাধ্যায় বলেন, “মাতৃশক্তি সব কিছুর ঊর্ধ্বে। তাই এই উদ্যোগকে সাধুবাদ ও স্বাগত জানাই। তবে ভোরের দিকে যাঁরা কাজে বেরোন, তাঁরা অনেকক্ষেত্রেই সরকারি বাস পান না। সেক্ষেত্রে বেসরকারি বাস বা মিনিবাসে চেপে যেতে হয়। ভবিষ্যতে যদি বেসরকারি বাসেও বিনামূল্যে পরিবহনের ব্যবস্থা করা যায়, তাহলে আরও ভালো হয়।”একই সুর শোনা গেল পূর্বের বিধায়ক চন্দ্রশেখর বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায়। তিনি বলেন, “মাকে আমরা মাতৃশক্তি রূপে পূজা করি। তাই সেই মাতৃশক্তিকে সম্মান জানাতেই এই উদ্যোগ।” সিটি সেন্টার বাস স্ট্যান্ডের এই ছবিটা আসলে গোটা রাজ্যের নারী জাগরণের এক প্রতীকী চিত্র। মহিলার কাছে এই সিদ্ধান্ত শুধুই আর্থিক স্বস্তি নয়, বরং স্বাধীনভাবে চলাফেরা ও আত্মনির্ভরতার নতুন দিশা।
