দুই দশক পর জেগে উঠছে দোমহানির শতবর্ষের গোশালাস্থানীয় উদ্যোগে শুরু পুনর্নির্মাণ, ফিরবে কার্তিক মেলা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য

বারাবনি, কাজল মিত্র : এক সময় যার ভোর কাটত গরুর গলার ঘণ্টার শব্দে, সন্ধ্যায় যার প্রাঙ্গণ আলোকিত হত প্রদীপের শিখায়, কার্তিক মাসে যেখানে ভিড় জমাত হাজার মানুষ— সেই বারাবনি ব্লকের দোমহানি বাজারের শতবর্ষপ্রাচীন গোশালা গত ২০ বছর ধরে ছিল নীরব।ভাঙা দেওয়াল, ধসে পড়া ছাদ আর আগাছায় ঢাকা উঠোন দেখে মনে হত ঐতিহ্যের ঠিকানা বুঝি বিস্মৃতিতেই।অবশেষে সেই নীরবতা ভাঙল।স্থানীয় বাসিন্দাদের সম্মিলিত উদ্যোগে শুরু হয়েছে গোশালার পুনর্নির্মাণ ও সংস্কারের কাজ। ইট-বালি-সিমেন্টের সঙ্গে এবার গাঁথা হচ্ছে এলাকার মানুষের আবেগও।

জীর্ণতা থেকে পুনর্জন্মের পথে দীর্ঘ অবহেলায় গোশালার অবস্থা এমন হয়েছিল যে নিরাপত্তার কারণে সেখানে থাকা গবাদি পশু ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় আসানসোল গোশালায়। এরপর থেকে বন্ধ হয়ে যায় সব কার্যক্রম। ধীরে ধীরে থমকে যায় এলাকার এক সময়ের প্রধান সামাজিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রটি।এখন আবার সেই প্রাঙ্গণে শোনা যাচ্ছে হাতুড়ি আর রাজমিস্ত্রির শব্দ। উদ্যোক্তারা জানাচ্ছেন, লক্ষ্য শুধু একটি ভবন সারানো নয়— একটি হারিয়ে যাওয়া উত্তরাধিকারকে নতুন করে ফিরিয়ে আনা।“এটি শুধু ইট-পাথরের কাজ নয়”
এই উদ্যোগের অন্যতম উদ্যোক্তা ও বিজেপির বারাবনি মণ্ডল-১-এর সহ-সভাপতি প্রসেনজিৎ গড়াই বলেন, “দোমহানি গোশালা দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চলের সনাতন সমাজের ধর্মীয় বিশ্বাস ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রতীক। আধুনিক ও নিরাপদ পরিকাঠামো দিয়ে এটিকে আবার গো-সংরক্ষণ ও গোসেবার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে।”

তাঁর আরও জানান, সংস্কার শেষ হলেই ফের চালু করা হবে কার্তিক মাসের সেই ঐতিহ্যবাহী সাত-আট দিনের পূজা, মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এক সময় যা ছিল দোমহানির প্রাণ।প্রশ্নও উঠছে
তবে ২০ বছর ধরে ধ্বংসের মুখে পড়ে থাকা একটি ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানের রক্ষণাবেক্ষণ এতদিন কেন হয়নি, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয়রা। কেন একটি সামাজিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রকে সময়ের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল, তার স্পষ্ট উত্তর এখনও মেলেনি।যদিও বর্তমান উদ্যোগে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ নতুন আশা জাগিয়েছে। উদ্যোক্তারা স্পষ্ট করেই বলেছেন, এটি কোনও একক ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলের প্রকল্প নয়। আর্থিক সহযোগিতা, স্বেচ্ছাশ্রম ও সামাজিক সমর্থন নিয়েই দ্রুত কাজ শেষ করে গোশালাকে আবার জনজীবনের কেন্দ্রে ফেরানোর পরিকল্পনা।স্মৃতির পুনর্দখল
দোমহানির এই পুনরুদ্ধার তাই কেবল একটি জীর্ণ বাড়ির সংস্কার নয়। এটি স্মৃতিকে ফিরে পাওয়া, ঐতিহ্যকে নতুন করে জাগিয়ে তোলা এবং একটি জনপদের সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়কে ধরে রাখার লড়াই।এখন এলাকাবাসীর চোখে একটাই অপেক্ষা— দুই দশকের অন্ধকার কাটিয়ে এই শতাব্দীপ্রাচীন প্রাঙ্গণ কবে আবার ভরে উঠবে মানুষের পদধ্বনিতে, পূজার মন্ত্রে আর মেলার কোলাহলে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *